‘আর-রাহমান’ নামের পরিচিতি

'আর-রাহমান' নামের পরিচিতি

‘আর-রাহমান’ নামের পরিচিতি

‘আর-রাহমান’ নামের পরিচিতি।
— শায়েখ ইয়াসির কাদি
তো, আমরা আলোচনা করছিলাম আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নাম আর রাহমান, আর রাহিম, আর হামুর রাহিমিন, খাইরুর রহিমিন এবং জুর রাহমাহ নিয়ে। একই শব্দমূল থেকে পাঁচটি আলাদা আলাদা নাম নির্গত করার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা “রাহমা” অর্থাৎ দয়া দেখানোর ধারণার উপর বিশেষ জোর প্রদান করছেন। আর এই বিষয়ে কোন প্রশ্নের অবকাশ নেই যে সমগ্র কুরআন জুড়ে আল্লাহর যে গুণটি মুখ্যগুণ হিসেবে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো “রাহমা” বা দয়া দেখানোর গুণ।
এমন আর কোন বিশেষ্য নেই যা থেকে পাঁচটি নাম নির্গত করা হয়েছে। আর যদি সংখ্যার দিক বিবেচনা করেন তাহলে দেখবেন, আল্লাহ কুরআনে যতবার নিজের প্রতি দয়ার গুণ আরোপ করেছেন, অন্য কোন গুণ এমনকি এর কাছাকাছি সংখ্যকবারও উল্লেখ করেননি। আল কুরআনের পাঁচশত এর অধিক adjective, verb এবং noun যেগুলো দিয়ে করুণা প্রদর্শনের ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে, তা আল্লাহ নিজের প্রতি আরোপ করেছেন। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা কুরআনে বলেছেন – كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَىٰ نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ – “তোমাদের প্রতিপালক দয়া-রহমাতের নীতি নিজের প্রতি অবধারিত করে নিয়েছেন।” (৬:৫৪) কাতাবা রাব্বুকুম আলা নাফসিহির রাহমা।
এই আয়াত আমাদের নিকট খুবই ইন্টারেস্টিং একটি পয়েন্ট তুলে ধরে। এমনকি আল্লাহর জন্যেও আইন রয়েছে। এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাও আইন মান্য করেন। কিন্তু আল্লাহর জন্য আইন প্রণয়নের অধিকার কারো নেই, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। আল্লাহ নিজের জন্য আইন প্রণয়নের অধিকার রাখেন। অন্য কারো আল্লাহর জন্য আইন রচনার অধিকার নেই। আর আল্লাহ যদি চাইতেন তিনি নিজের জন্য যেকোনো কিছু লিখে নিতে পারতেন। এমনকি আল্লাহরও বিধিবিধান রয়েছে যেগুলো তিনি মেনে চলেন। কিন্তু সেই বিধিবিধান কোনগুলো? আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা তার কয়েকটির কথা আমাদের জানিয়েছেন। তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি হল – “ইন্না রাহমাতি তাগ্লিবু গাদাবি।”
আমাদের রাসূল (স) বলেছেন – এই হাদিসটি বুখারি এবং মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, আর এটা কুরআনের বক্তব্যকে সমর্থন করছে – তোমাদের রব নিজের জন্য এটি অবধারিত করে নিয়েছেন, আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে ( এখানে পঞ্চাশ হাজার মানে আমাদের উপলব্ধির বাইরে) আল্লাহ কোন কিছু সৃষ্টি করার পূর্বে নিজের জন্য এটা অবধারিত করে নিয়েছেন, নিজের কাছে রাখা একটি বইতে তিনি এটা লিখে নিয়েছেন, (আক্ষরিকভাবে হাদিসে এটাই বলা হয়েছে, কিতাবান ইন্দা নাফসি)… আল্লাহর নিজের কাছে একটি বই আছে।
এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার জন্যেও কোড বুক আছে, আইনের বই আছে। সবার জন্য আইন আছে, এমনকি আল্লাহ জন্যেও। কিন্তু, পার্থক্য হল, আল্লাহ নিজের জন্য নিজেই আইন লিখেন। আল্লাহর এমন নীতি রয়েছে তিনি তাঁর দাসদের ওয়াদা দিয়েছেন যে তিনি সেটা মেনে চলবেন। এক নাম্বারে আমরা কোন আইনটির কথা জানি, কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে? “ইন্না রাহমাতি তাগ্লিবু গাদাবিই” “আমার রাহমা সবসময় আমার রাগের উপর বিজয়ী হবে।” আমার দয়া সবসময় আমার ক্রোধের উপর বিজয় লাভ করবে। এই জন্য আল্লাহ কুরআনে বলেছেন – “کَتَبَ رَبُّکُمۡ عَلٰی نَفۡسِہِ الرَّحۡمَۃَ” – “তোমাদের প্রতিপালক দয়া-রহমাতের নীতি নিজের প্রতি অবধারিত করে নিয়েছেন” (6:54)
তাই, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সবচেয়ে কমন যে গুণটির কথা সমগ্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে তা হল ‘রাহমা’ বা দয়া প্রদর্শনের গুণ। আর আল্লাহর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নাম যে একটি মাত্র ক্রিয়াপদ এবং একটি মাত্র বিশেষ্য থেকে নির্গত হয়েছে তা হল এমন ক্রিয়াপদ এবং বিশেষ্য যা দিয়ে দয়া প্রদর্শনের ধারণা প্রকাশ করা হয়।
আমি যেমন আগে বলেছি, করুণা প্রদর্শনের ধারণা থেকে আল্লাহ পাঁচটি নাম উল্লেখ করেছেন। আমরা সংক্ষেপে এই পাঁচটি নাম নিয়ে কথা বলব। এই নামগুলোর গুরুত্বের কারণে আমরা এর জন্য আমাদের দুইদিনের আলোচনার সময় উৎসর্গ করবো। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহর রাহমা হল আল্লাহর প্রধান গুণ।
আর রাহমান নামটি …আর রাহমান নামটি একটি অনন্য নাম। আল কুরআনে এই নামের মত অন্য কোন নাম নেই, একমাত্র আল্লাহ নামটি ছাড়া। আল্লাহ নামটির এবং আর রাহমান নামটির এমন অনন্য মর্যাদা রয়েছে, অন্য নামগুলোর যেটি নেই। আর তা হল, এই উভয় নামকে আল্লাহর প্রধান নাম হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণত, আল্লাহ নাম এবং আর রাহমান নাম কুরআনে এককভাবে আসে, অন্য নামের সাথে যুক্ত হয়ে আসে না। আসলেও খুবই বিরল। কিন্তু সাধারণত একা একা আসে।
আর আর রাহমান নামটি সরাসরি আল্লাহ নামের সাথে সংযুক্ত। قُلِ ادۡعُوا اللّٰہَ اَوِ ادۡعُوا الرَّحۡمٰنَ – আল্লাহ বলেন – বল, ‘তোমরা (তোমাদের রবকে) ‘আল্লাহ’ নামে ডাক অথবা ‘রাহমান’ নামে ডাক, যে নামেই তোমরা ডাক না কেন, اَیًّامَّا تَدۡعُوۡا – এই দুই নামের যে নামেই ডাক না কেন فَلَہُ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی – কেননা সকল সুন্দর নামই তো তাঁর। (17:110)
তো, আল্লাহ বলছেন আল্লাহ এবং আর রাহমান নামের দিকেই অন্য সকল নামের প্রত্যাবর্তন। অন্য কোন নামকেই এত উচ্চ মর্যাদায় উন্নত করা হয়নি, এই দুইটি নাম ছাড়া, আল্লাহ এবং আর রাহমান।
আর এটি সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যা আবু হুরাইরা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন – “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় নাম হল আব্দুল্লাহ এবং আব্দুর রাহমান।” অর্থাৎ, আল্লাহর দাস, আল্লাহর ইবাদতকারী, এবং আর রাহমানের দাস।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আল-কুরআনে তাঁর নাম আর রাহমান ৫৭ বার উল্লেখ করেছেন। ৫৭ বার!! প্রায় ৫০ বার নামটি এককভাবে এসেছে। অন্য নামের সাথে যুক্ত হয়ে আসেনি। আমি যেমন আগে বলেছি, আল্লাহ নামটি ছাড়া আর কোন নাম এককভাবে আসেনি। যেমন, “আর রাহমান, আল্লামাল কুরআন, খালাকাল ইনসান।” এখানে নামটি এককভাবে এসেছে। “আর রাহমান।” আর আল্লাহ কুরআনের কোন সূরা তাঁর নাম দিয়ে শুরু করলে করেছেন ‘আর রাহমান’ এবং ‘আল্লাহ’ নাম দিয়ে। অন্য আর কোন নাম দিয়ে কোন সূরা শুরু করা হয়নি।
সাধারণত, যে সমস্ত আয়াতে আল্লাহর মহিমা এবং গৌরবের কথা বলা হয়েছে সেসব আয়াতে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা “আর রাহমান” নামটি ব্যবহার করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ যখন তাঁর সবচেয়ে রাজোচিত সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছেন, সবচেয়ে বৃহদাকার সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছেন…প্রসঙ্গতঃ তা হল, আল্লাহর সিংহাসন। আল্লাহর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি হল, তাঁর সিংহাসন, তাঁর আরশ। কুরআনে আল্লাহ যখনি আরশের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি ‘আর রাহমান’ নাম ব্যবহার করেছেন। – “اَلرَّحۡمٰنُ عَلَی الۡعَرۡشِ اسۡتَوٰی” – “দয়াময় আরশে সমাসীন।” – (২০:৫) কুরআনের সাত জায়গায় এই বাক্যাংশটি এসেছে। ৭ জায়গায়, একেবারে হুবহু এই কথাগুলো। আল্লাহ কখনো বলেননি, “আল্লাহু আলাল আরশিস তাওয়া”; তিনি সবসময় বলেছেন – “আর রাহমানু আলাল আরশিস তাওয়া।”
এভাবে উল্লেখের পেছনে বিজ্ঞতার ব্যাপারটি ইবনে কাইয়েম (র) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন – যেহেতু আল্লাহর আরশ হল আল্লাহর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি…প্রসঙ্গতঃ আমরা বহু হাদিস থেকে এটা জেনেছি। রাসূলুল্লাহ (স) উল্লেখ করেছেন, এটা হল আল্লাহর সবচেয়ে গুরুতম সৃষ্টি, বৃহত্তম সৃষ্টি। আরশ যেহেতু সবচেয়ে বড় সৃষ্টি, ইবেন কাইয়েম বলেন, তাই আল্লাহ সেই গুণটির কথা উল্লেখ করতে চেয়েছেন যা এমনকি তাঁর বৃহত্তর সৃষ্টিকেও ঢেকে রেখেছে আর তা হল, দয়া প্রদর্শনের গুণ। আল্লাহর করুণা এমনকি তাঁর সবচেয়ে বড় সৃষ্টিকেও ঢেকে রেখেছে। “আর রাহমানু আলাল আরশিস তাওয়া।”
আল্লাহর কোনো নাম একই …..এটা কিছুটা অগ্রসর ছাত্রদের জন্য। আমি আরবি ছরফ এর নিয়ম-কানুন দিয়ে আপনাদের মাথা গুলিয়ে ফেলতে চাচ্ছি না। আরবি ভাষার একটি সৌন্দর্য হলো, আপনি তিন অক্ষরের একটি শব্দ থেকে বহু noun, adjective, এমনকি adverb বের করতে পারবেন; শব্দের সাথে কী যোগ করেন আর কী বাদ দেন তার উপর ভিত্তি করে। যেমন, سمع অর্থ কোনো কিছু শোনা। আর سميع এবং سامع উভয় দ্বারা একই ভাব প্রকাশ করা হয় কিন্তু অর্থে ভিন্নতা রয়েছে। سميع মানে যিনি সবকিছু শোনেন। আর سامع অর্থ, যিনি এখন শুনতে পারছেন। আল্লাহ سامع নন, আল্লাহ হলেন سميع এগুলো আরবি ব্যাকরণের একটি শাখা ছরফে আলোচনা করা হয়।
আমি যা বলতে চাচ্ছি, الرحمان এর শেষ ‘আলিফ নুন’ রয়েছে। এর ক্রিয়াপদ হল, রাহিমা। “আর রহমান” এর শেষ রয়েছে আলিফ নুন। আল্লাহর অন্য কোনো নাম এই স্ট্রাকচারে আসেনি। السميع البصير নামগুলোতে এক ধরণের গঠনপ্রণালী দেখা যায়। الرحيم ও একইভাবে গঠিত হয়েছে। ইয়া যুক্ত করার মাধ্যমে। سمع থেকে سميع, তারপর بصر থেকে بصير এরপর “” “রাহিমা” থেকে “রাহিইম” এটা খুবই কমন। কিন্তু ক্রিয়াপদের শেষে যে ‘আলিফ-নুন’ যুক্ত করেন…যেমন, ‘রাহিমা’ থেকে “রহমা-ন।” অন্য কোনো নাম এমন নেই যেখানে তিন অক্ষরের ক্রিয়াপদ থেকে ‘আলিফ-নুন’ যুক্ত করে একটি নাম গঠন করা হয়েছে – আর রহমান ছাড়া। কেন? কারণ, ‘আলিফ-নুন’ যখন একটি ভার্বের শেষে যোগ করেন, তখন এটা এই ক্রিয়াপদের এমন শক্তি নির্দেশ করে, অন্য কোন বিশেষ্যের গঠনে যা অতুলনীয়।
অন্য কথায়, আরবি ভাষায় সবচেয়ে শক্তিশালী যত ধরণের বিশেষ্য রয়েছে একটি কাজের বর্ণনা দেওয়ার জন্য – আশা করি আপনারা বুঝতে পারছেন, এখানে একটু ব্যাকরণ আলোচনা করা হচ্ছে। সবচেয়ে শক্তিশালী ধরণের বিশেষ্যের রূপ হল – কোন একটি কাজের বর্ণনা দেওয়ার জন্য – যখন উক্ত ক্রিয়াপদের শেষে আলিফ নুন যুক্ত করেন।
তাহলে, আর রাহমান হল এমন সত্তা যিনি সবচেয়ে শক্তিশালী এবং চিরস্থায়ী করুণার অধিকারী। আল্লাহর অন্য কোন নামের শেষে এই আলিফ-নুন নেই। আর এ জন্যই ‘আর রাহমান’ এতটা শক্তিশালী। আল্লাহ সবসময় রাহমাহর গুণে গুণান্বিত। আর তিনি যতকিছু করেন সবকিছুতে তাঁর দয়ার বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। আর তাই আল্লাহ যখন রাজোচিত, জাঁকজমকপূর্ণ কিছুর বর্ণনা দিয়েছেন তখনি ‘আর রাহমান’ নামটি ব্যবহার করেছেন।
উদাহরণ স্বরূপঃ “আর রাহমানু, আল্লামাল কুরআন, খালাকাল ইনসান।” কারণ, আল্লাহ হলেন আর রাহমান তাই তিনি সমগ্র মানব জাতি সৃষ্টি করেছেন। এই কারণে আমাদের বহু স্কলার বলেন – রাহমান এবং রহিমের মাঝে পার্থক্য হল, রাহমান হল সমগ্র মানব জাতির জন্য। আর রহিম হল বিশ্বাসীদের জন্য। এটা হল মূল পার্থক্য। আমরা পরবর্তীতে অন্য পার্থক্যগুলো নিয়ে আলোচনা করব। কিন্তু প্রাথমিক যে পার্থক্যের কথা আমাদের স্কলাররা উল্লেখ করেছেন… আর রাহমান হল সমগ্র সৃষ্টি জগতের জন্য। “আর রাহমানু, আল্লামাল কুরআন, খালাকাল ইনসান।” সমগ্র মানবজাতি তিনি সৃষ্ট করেছেন। অন্যদিকে ‘আর রহিমের’ ক্ষেত্রে সাধারণভাবে বলা হয়, ‘আর রহিম’ হল যারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন তাদের জন্য। “وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا – আল্লাহ মুমিনদের জন্য রাহিম।”تَحِيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَهُ سَلَامٌ –
“যেদিন আল্লাহর সাথে মিলিত হবে; সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম।” (৩৩:৪৩-৪৪) এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ “রাহিম” শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
তাহলে, “আর রাহিম” বিশেষ ধরণের দয়া যা আল্লাহর বাছাইকৃত বান্দাদের প্রতি প্রদর্শন করা হয়। আর তারা হলেন ঈমানদাররা। “আর রাহমান” হল এমন শক্তিশালী দয়া যা সবকিছুর উপর পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। কারণ, আল্লাহ হলেন করুণার গুণে গুণান্বিত। এমনকি কাফেররাও আল্লাহর দয়া থেকে উপকৃত হয়, “আর রাহমান” এর সর্বব্যাপী দয়ার কারণে। এ জন্য আমাদের রাসূল (স) বলেছেন – আল্লাহ যদি দয়ালু না হতেন তাহলে তিনি কোন কাফেরকে এক ফোঁটা পানিও দিতেন না। কিন্তু আল্লাহর দয়ার কারণে একজন কাফেরকেও দৈনিক রিজিক প্রদান করা হয়।
————————-
এবং আমাদের রাসূল (স) উল্লেখ করেছেন, যখন আল্লাহ সৃষ্টি জগতকে সৃষ্টি করলেন, তিনি তাঁর দয়াকে একশো ভাগে ভাগ করলেন। (এখানে একটা ব্যাপার মনে রাখুন, এটি একটি প্রতীকী হাদিস। আল্লাহর দয়ার কোন শেষ নেই, তাঁর দয়াকে ভাগ করা যাবে না। তাঁর দয়া অসীম। এই উদাহরণের মাধ্যমে আমাদেরকে একটি ধারণা দেয়া হচ্ছে মাত্র।) তিনি তাঁর করুণাকে ১০০ ভাগে ভাগ করলেন। তার থেকে এক ভাগ তিনি এই দুনিয়াতে অবতীর্ণ করলেন। আর এই কারণে গোটা সৃষ্টি জগতে কিছুটা দয়া পরিলক্ষিত হয়। এর কারণে মানুষ একে অন্যের প্রতি দয়ালু। রাসূল (স) বলেছেন, এই কারণে মা ঘোড়া তার বাচ্চার প্রতি দয়া দেখায়। এই কারণে মা পাখি তার বাচ্চাকে আহার করায়।
আল্লাহ ৯৯ ভাগ ক্ষমা সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আর সেই ৯৯ ভাগ ক্ষমা কিয়ামতের দিন ব্যবহার করা হবে। এখন, একবার ভেবে দেখুন, সময়ের শুরু থেকে শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি দয়া যেকোনো সৃষ্টি দেখিয়েছে – যে কোন পাখি, যে কোন প্রাণী, যে কোন মানুষ দেখিয়েছে যে কোন সৃষ্টির প্রতি, যে কোন গাছের প্রতি — আপনি এই সব দয়াগুলোকে যদি একত্রিত করেন, বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে, এই সমস্ত দয়া মাত্র এক শতাংশ দয়া থেকে এসেছে। আর ৯৯ ভাগ দয়া আল্লাহ এক দিন ব্যবহার করবেন। আর সেই দিনটি হল শেষ বিচারের দিন।
আর এই জন্য আমাদের রাসূল (স) বলেছেন – যদি কাফের জানতো আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা কত দয়ালু তাহলে এমনকি কাফেরও জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে আশাবাদী থাকতো। এটাই হল আল্লাহর দয়ার শক্তি।
তাই প্রিয় ভাই এবং বোনেরা, আমরা এখানে একটু থামবো, আগামী কাল আবার ‘রাহমার’ ধারনা নিয়ে কথা বলবো। কিন্তু আজ একটি বিষয় আপনাদের চিন্তা করার জন্য রেখে যাচ্ছি, যখন আল্লাহ ৫০০ এর অধিক আয়াতে নিজেকে দয়ালু হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যখন আল্লাহ পাঁচটি আলাদা ‘প্রপার নাউন’ ব্যবহার করে নিজের দয়ার বর্ণনা দিয়েছেন, যখন আল্লাহ বলেছেন – তিনি হলেন রাহমান, তিনি হলেন রহিম, তিনি হলেন ‘আর হামুর রাহিমিন’ (সকল দয়াবানদের মাঝে সবচেয়ে বেশি দয়াবান), তিনি হলেন ‘খাইরুর রাহিমিন’ (সকল দয়াবানদের মাঝে শ্রেষ্ঠ দয়াবান), তিনি হলেন ‘জুর রাহমা’ (সকল রহমতের মালিকানা যার) — তখন কীভাবে আমরা আল্লাহর দয়ার প্রতি আশাহীন হতে পারি! কীভাবে আমরা আল্লাহর করুণার প্রতি আশা হারাতে পারি!!
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহর দয়ার প্রতি আশা হারানো আল্লাহর প্রতি অপমানজনক। আল্লাহর দয়ার প্রতি আশা হারানো আল্লাহর প্রতি বড় ধরণের অপমান। আর এটা আমার কথা নয়। এটা হাদিসে এসেছে। আমাদের রাসূল (স) বলেছেন – মনোযোগ দিয়ে শুনুন – আকবারুল কাবায়ের, সকল কবিরা গুনাহের মাঝে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হল… গুনাহের ধরণ হল কবিরা এবং সগিরা তথা ছোট এবং বড়। আমরা কবিরা গুনাহগুলো সম্পর্কে জানি, রাসূল (স) এখানে বলছেন – সকল কবিরা গুনাহের মাঝে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ – আকবারুল কাবায়ের। এখন, কবিরা গুনাহ কোনগুলো? এক নাম্বার, শিরক বিল্লাহ। দুই নাম্বার হল, আল কুনুউতু মির রাহমাতিল্লাহ। এই গুনাহটি তালিকার দুই নাম্বারে। “আল্লাহর দয়ার ব্যাপারে আশা ছেড়ে দেওয়া।”
এটি কেন আল্লাহর প্রতি অপমানজনক? এমনকি এই দুনিয়াতে, ধরুন, কেউ একজন খুবই দয়ালু দাতা। আপনি তার কাছে সামান্য কয়টি পয়সা চাইলেন। আপনি অসুবিধায় পড়েছেন তার কাছে এসে বললেন, আপনি কি আমাকে দয়া করে সামান্য কয়টা টাকা দিতে পারবেন? আর মনে মনে ভাবতে লাগলেন, না, তিনি আমাকে এক টাকাও দিবেন না। এই ভাবনাটা কি দয়ালু রাজার প্রতি অপমানজনক নয়? এটা কি ঐ ধনী ব্যক্তির প্রতি অপমান নয়? যিনি তার উদারতা এবং দান-খয়রাতের জন্য বিখ্যাত। যে তিনি আমাকে এক টাকাও দিবেন না। আপনার তো এভাবে চিন্তা করাই উচিত নয়। তাহলে যখন, وَلِلَّهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَىٰ – “মহোত্তম উপমা সব আল্লাহর জন্য”(16:60)
যে কেউ ধারণা করে যে, সে একাই এতো বেশি পাপ কামাই করেছে যে আল্লাহর পক্ষে তাকে ক্ষমা করা সম্ভব নয়, আল্লাহর শপথ! কি এক অপমানজনক চিন্তা! কে আপনি? আর কেমন আপনার পাপ আল্লাহর ক্ষমার তুলনায়? আপনি কি আল্লাহর দয়াকে সীমিত করে ফেলছেন? এমনভাবে যে আপনি একা, এক জীবনে এতো বেশি পরিমাণে পাপ করতে পারেন যে আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করতে পারবেন না? এটা বড় ধরণের অপমান! আর এই কারণে এটা এক ধরণের কুফর এই ধারণা করা যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন না। এই জন্য আমাদের রাসূল (স) বলেছেন, শিরকের পরেই দুই নাম্বারে বড় গুনাহ হল, আল্লাহর দয়ার ব্যাপারে আশা ছেড়ে দেওয়া। আর কুরআনে এসেছে – وَ مَنۡ یَّقۡنَطُ مِنۡ رَّحۡمَۃِ رَبِّہٖۤ اِلَّا الضَّآلُّوۡنَ – “‘পথভ্রষ্টরা ছাড়া, কে তার রবের রহমত থেকে নিরাশ হয়’ ? ” (১৫:৫৬)
আল্লাহ কুরআনে আরও বলেছেন – قُلۡ یٰعِبَادِیَ الَّذِیۡنَ اَسۡرَفُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَغۡفِرُ الذُّنُوۡبَ جَمِیۡعًا – “বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ…” তুমি সীমা লঙ্ঘন করেছ, আল্লাহ সরাসরি আমাদের সাথে কথা বলছেন لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰہِ – তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন।”
প্রিয় ভাই এবং বোনেরা, রাহমান, রহিম, আর-হামুররাহিমিন আমাদের প্রতি অনবরত রাহমা প্রদর্শন করতে পারেন। আর সকল সৃষ্টির সম্মিলিত রাহমার চেয়েও আল্লাহ বেশি রাহমা দেখাতে পারেন। আর এতে তার রহমতের কোন কমতি হবে না। তিনি যদি গোটা সৃষ্টি জগতকে তার চিরস্থায়ী রাহমা প্রদর্শন করেন সেই রাহমা কখনো শেষ হবে না।
তাই, আমার আপনার মত ক্ষুদ্র সৃষ্টি কি এমন পাপ করতে পারবো যা আল্লাহর রাহমাকে ছাড়িয়ে যাবে। এই মাস (রমজান) হল রহমতের মাস। এটা হল শাহরু রাহমা। এই মাসে আমরা আল্লাহর রহমত চাই। আর এই দিনগুলো হল রহমতের দশ দিন। চলুন, নতুন করে আবার নিয়ত করি যে, আমরা আল্লাহর রাহমা অর্জন করব। চলুন, এই আশায় বুক বাঁধি। কারণ, এই আশা হল ঈমানের অংশ। চলুন, আর রাহমান এবং আর-রহিমে বিশ্বাস করি। চলুন, এই বিশ্বাসে বুক বাঁধি যে আর-রাহমান আমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন। আর-রহিম আমাদেরকে তাঁর রহমতে আবৃত করে নিবেন। ইনশাআল্লাহু তায়ালা আগামী কাল আমরা রাহমার সাথে সংশ্লিষ্ট আল্লাহর অন্য নামগুলো নিয়ে কথা বলবো। ওয়াস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

Leave a Comment